ঈমানের সুরক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা: কোরআন ও হাদিসের আলোকে পথনির্দেশ

Estimated read time 1 min read

ঈমান মানবজীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। দুনিয়ার সকল ধন-সম্পদ, ক্ষমতা ও সম্মান একদিকে, আর ঈমান অন্যদিকে—তুলনায় ঈমানই অমূল্য। ঈমান ছাড়া মানুষের সকল আমল নিষ্ফল, সকল কৃতিত্ব অর্থহীন। একজন মুমিনের পরিচয়, মর্যাদা ও পরকালীন মুক্তির মূল চাবিকাঠি হলো ঈমান। কিন্তু এই ঈমান অতি সংবেদনশীল ও পরিবর্তনশীল; কখনো তা বৃদ্ধি পায়, আবার কখনো দুর্বল হয়ে যায়। তাই ইসলাম শুধু ঈমান অর্জনের নির্দেশ দেয়নি; বরং ঈমান সংরক্ষণ, রক্ষা ও সুদৃঢ় করার জন্য সুস্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনাও প্রদান করেছে।

আধুনিক যুগে শিরক, কুফর, বিদআত, নাস্তিকতা, ভোগবাদ, নৈতিক অবক্ষয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রান্তির যে স্রোত, তাতে ঈমান রক্ষা করা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন। এ প্রেক্ষাপটে ইসলামের নির্দেশনাগুলো জানা ও বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।

বিশুদ্ধ আকিদা ঈমান রক্ষার প্রথম শর্ত
ঈমানের ভিত্তি হলো সঠিক আকিদা। আকিদা যদি বিশুদ্ধ না হয়, তবে আমলের কোনো মূল্য নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন—‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে শিরক করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ৭২)
ইসলাম তাওহিদের আকিদাকে ঈমানের কেন্দ্রবিন্দু করেছে। আল্লাহর সত্তা, গুণাবলি, ইবাদত ও কর্তৃত্বে কাউকে শরিক না করা—এটাই ঈমানের মূল কথা। কবরপূজা, তাবিজ-কবচে বিশ্বাস, জ্যোতিষবিদ্যা, ভাগ্য গণনা—এসব ঈমান ধ্বংসকারী বা দুর্বলকারী বিষয়। তাই ঈমান রক্ষায় প্রথম নির্দেশনা হলো শিরক থেকে পূর্ণ বিরত থাকা এবং সহিহ আকিদা শেখা ও ধারণ করা।

কোরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক
কোরআন হলো ঈমানের প্রাণ, সুন্নাহ হলো তার বাস্তব রূপ। আল্লাহ তাআলা বলেন—‘নিশ্চয়ই এই কোরআন এমন পথ নির্দেশ করে যা সর্বাধিক সঠিক।’ (সুরা ইসরা/বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৯)

যে ব্যক্তি নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত করে, অর্থ বুঝে পড়ে, চিন্তা-গবেষণা করে এবং জীবনে বাস্তবায়ন করে—তার ঈমান দৃঢ় হয়। একইভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ ঈমান রক্ষার ঢালস্বরূপ। বিদআত ও মনগড়া আমল থেকে দূরে থাকাও ঈমান সুরক্ষার অন্যতম উপায়।

ফরজ ইবাদতে যত্নশীলতা
ইবাদত ঈমানকে শক্তিশালী করে, আর গুনাহ ঈমানকে দুর্বল করে। নামাজ, রোজা, জাকাত, হজ—এসব ফরজ ইবাদত ঈমানের প্রহরী। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—‘বান্দা ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হলো নামাজ।’ (সহিহ মুসলিম)
নামাজ ত্যাগ করলে ঈমান মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে। নিয়মিত নামাজ, বিশেষ করে জামাতে নামাজ, ঈমানকে জীবন্ত রাখে। রোজা আত্মসংযম শেখায়, জাকাত সম্পদের মোহ কাটায়, হজ তাওহিদের বাস্তব প্রশিক্ষণ দেয়—সব মিলিয়ে ফরজ ইবাদত ঈমান রক্ষার অপরিহার্য উপাদান।

গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা
গুনাহ ঈমানের বিষ। ছোট গুনাহ জমে বড় গুনাহে পরিণত হয়, আর বড় গুনাহ ঈমান নিভিয়ে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—‘মুমিন গুনাহ করলে তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে।’ (তিরমিজি)
চোখের গুনাহ, জিহ্বার গুনাহ, হারাম উপার্জন, সুদ, ঘুষ, ব্যভিচার, মিথ্যা—এসব ঈমান ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। তাই ইসলাম ঈমান রক্ষার জন্য হারাম থেকে কঠোরভাবে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়েছে।

তাওবা ও ইস্তিগফারের গুরুত্ব
মানুষ ভুল করে, গুনাহ হয়—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাওবা না করা মারাত্মক বিপদ। আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘হে মুমিনরা! তোমরা সকলে আল্লাহর কাছে তাওবা কর।’ (সুরা নুর, আয়াত : ৩১)
নিয়মিত ইস্তিগফার ঈমানকে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে। তাওবা ঈমানকে পুনরুজ্জীবিত করে, হূদয়কে নরম করে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করে।

সৎসঙ্গ বেছে নেওয়া
মানুষ তার বন্ধুর দ্বিনের ওপর থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—‘তোমাদের প্রত্যেকের উচিত দেখা—সে কাকে বন্ধু বানাচ্ছে।’ (আবু দাউদ)
দ্বিনদার, তাকওয়াবান, আলেম ও সৎ লোকদের সঙ্গ ঈমান বাড়ায়। আর নাস্তিক, গুনাহগার ও ভ্রান্ত লোকদের সঙ্গ ঈমান ধ্বংস করে। তাই ঈমান রক্ষায় সত্ সঙ্গ বেছে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

দুনিয়াপ্রীতি ও ভোগবাদ থেকে সতর্কতা
অতিরিক্ত দুনিয়াপ্রীতি ঈমানের সবচেয়ে বড় শত্রু। আল্লাহ তাআলা বলেন—‘দুনিয়ার জীবন ধোঁকার সামগ্রী ছাড়া কিছুই নয়।’ (সুরা হাদিদ, আয়াত : ২০)
সম্পদ, পদ, খ্যাতি যদি অন্তরে আসন গেড়ে বসে—তবে ঈমান দুর্বল হয়। ইসলাম দুনিয়া ত্যাগ করতে বলেনি, কিন্তু দুনিয়াকে অন্তরে জায়গা দিতে নিষেধ করেছে।

ইলম অর্জন ও অজ্ঞতা দূর করা
অজ্ঞতা ঈমানের শত্রু। সহিহ ইলম ছাড়া মানুষ শিরক, বিদআত ও বিভ্রান্তিতে পড়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন— ‘ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ।’ (ইবনে মাজাহ)
কোরআন-হাদিসের সহিহ জ্ঞান ঈমান রক্ষার শক্ত ভিত তৈরি করে।

আল্লাহর ওপর ভরসা ও দোয়ার গুরুত্ব
তাওয়াক্কুল ঈমানের অংশ। দোয়া মুমিনের অস্ত্র। আল্লাহ তাআলা বলেন—‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা গাফির, আয়াত : ৬০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও দোয়া করতেন— ‘হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে তোমার দ্বিনের ওপর স্থির রাখ।’ (তিরমিজি)

ঈমানের নিরাপত্তা
ঈমান একবার অর্জন করলেই নিরাপদ—এমন নয়। ঈমান আজীবন পাহারা দিতে হয়। ইসলামের নির্দেশনাগুলো মূলত ঈমানকে রক্ষা করার জন্যই। বিশুদ্ধ আকিদা, ইবাদত, গুনাহ থেকে বাঁচা, তাওবা, ইলম, সৎ সঙ্গ ও আল্লাহর স্মরণ—এসবের সমন্বয়েই ঈমান সুরক্ষিত থাকে। আজকের ফিতনাপূর্ণ যুগে ঈমান রক্ষা করা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। প্রয়োজন শুধু আন্তরিকতা, সচেতনতা ও আল্লাহর সাহায্য কামনা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ঈমানের সঙ্গে জীবন ও ঈমানের সঙ্গে মৃত্যু দান করুন। আমিন।

লেখক : মুহতামিম, জহিরুল উলুম মহিলা মাদরাসা, গাজীপুর।

azadservice https://www.azadservice.com

WhatsApp : wa.me/8801933307999
Email: dropshippingbuisness2000@gmail.com
Call : +8801933307999
Youtube : https://www.youtube.com/@DropshippingService?sub_confirmation=1

You May Also Like

More From Author

+ There are no comments

Add yours