মানুষের প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণে ইসলাম বাহ্যিক রূপ, সম্পদ, বংশ কিংবা ক্ষমতাকে মানদণ্ড বানায়নি। বরং আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের ভেতরের গুণাবলি, চরিত্র, ঈমান, আমল ও মানবকল্যাণমূলক ভূমিকার ওপর ভিত্তি করে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করেছেন। কোরআন ও হাদিসে বারবার এমন মানুষদের কথা এসেছে, যারা আল্লাহর কাছে প্রিয়, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দৃষ্টিতে সর্বোত্তম। নবীজির বাণীগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে আমরা দেখতে পাই—সর্বোত্তম মানুষ হওয়ার পথ বহুমুখী হলেও মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ঈমান, চরিত্র ও কল্যাণ।
এক. কোরআনের শিক্ষার্থী ও শিক্ষক
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন— ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যে নিজে কোরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়।’ (সহিহ বুখারি, ৫০২৭)
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে কোরআনের সাথে সম্পর্কই মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের প্রধান মানদণ্ড। কোরআন আল্লাহর কালাম, হেদায়েতের চূড়ান্ত উত্স। যে ব্যক্তি নিজে কোরআন শেখে, তার জীবন আলোকিত হয়। আর যে অন্যকে শেখায়, সে সমাজকে আলোকিত করে। এভাবে কোরআন শিক্ষা ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়ের কল্যাণ নিশ্চিত করে।
দুই. উত্তম চরিত্রের অধিকারী
নবীজি (সা.) বলেন—‘নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ওই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম আচরণের অধিকারী।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০৩৫)
ইসলামে চরিত্রের গুরুত্ব অপরিসীম। ইবাদত মানুষের আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে, আর চরিত্র মানুষের সাথে সম্পর্ক সুন্দর করে। নবীজির দৃষ্টিতে উত্তম আখলাক ছাড়া শ্রেষ্ঠত্ব অসম্পূর্ণ। নম্রতা, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা, সত্যবাদিতা—এসব গুণই একজন মানুষকে প্রকৃত অর্থে শ্রেষ্ঠ করে তোলে।
ad
তিন. ঋণ পরিশোধে উত্তম
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—‘তোমাদের মধ্যে সর্বসেরা ব্যক্তি সে, যে ঋণ পরিশোধের বেলায় ভালো।’ (বুখারি, হাদিস : ২৩০৫)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, ইসলাম শুধু ইবাদত নয়; লেনদেন ও সামাজিক দায়িত্বেও শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করে। যে ব্যক্তি ঋণ পরিশোধে টালবাহানা করে না; বরং উদারতা ও সদাচরণ দেখায়—সে রাসুল (সা.)-এর কাছে সর্বসেরা।
চার. যাঁর কাছ থেকে কল্যাণ আশা করা যায়
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যার কাছ থেকে সবাই কল্যাণ আশা করে, অনিষ্টের আশঙ্কা করে না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২২৬৩)
একজন মুমিন এমন হবেন, যাঁর উপস্থিতিতে মানুষ নিরাপদ বোধ করবে। তার হাত, মুখ ও আচরণ থেকে কেউ ক্ষতির আশঙ্কা করবে না। এই গুণ সমাজে শান্তি ও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করে।
পাঁচ. পরিবারের কাছে উত্তম ব্যক্তি
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—‘তোমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ওই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে ভালো।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৪১৭৭)
অনেকে বাইরে খুব ভালো, কিন্তু পরিবারের প্রতি কঠোর। ইসলাম এই দ্বৈত চরিত্রকে গ্রহণ করে না। পরিবারের সাথে উত্তম আচরণ—স্ত্রী, সন্তান, পিতা-মাতার হক আদায়—এগুলোই প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক।
ছয়. দীর্ঘ জীবন ও উত্তম আমল
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—‘তোমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি সেই, যে তোমাদের মধ্যে বয়সে বেশি এবং [নেক] কাজে উত্তম।’ (মুসনাদ আহমাদ : ৭২১২, ৯২৩৫)
দীর্ঘ জীবন নিজে কোনো গৌরব নয়; বরং সেই জীবন যদি নেক আমলে পূর্ণ হয়, তবেই তা শ্রেষ্ঠত্বের কারণ হয়। দীর্ঘ জীবনে ইবাদত, দাওয়াহ, মানবসেবা—এসবের মাধ্যমে একজন মানুষ আল্লাহর কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে।
সাত. মানুষের জন্য উপকারী ব্যক্তি
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—‘সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ সেই ব্যক্তি, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৩২৮৯, সিলসিলা সহিহাহ, হাদিস : ৪২৬)
এটি ইসলামের সামাজিক দর্শনের মূলনীতি। যে ব্যক্তি শুধু নিজের কথা না ভেবে অন্যের উপকারে আসে—জ্ঞান দিয়ে, সম্পদ দিয়ে, শ্রম দিয়ে—সে-ই আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ।
আট. পরিচ্ছন্ন অন্তর ও সত্যবাদী মুখ
নবীজি সা. বলেন, শ্রেষ্ঠ মানুষ হলো—‘যার অন্তর পরিচ্ছন্ন ও মুখ সত্যবাদী।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪২১৬, সহিহুল জামে, হাদিস : ৩২৯১)
পরিচ্ছন্ন অন্তর মানে হিংসা, বিদ্বেষ, খেয়ানত ও জুলুমমুক্ত হূদয়। বাহ্যিক ইবাদতের সাথে অন্তরের পবিত্রতা যুক্ত না হলে প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হয় না।
নয়. উত্তম সঙ্গী ও প্রতিবেশী
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—‘আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম সঙ্গী সে, যে তার সঙ্গীর কাছে উত্তম। আর সর্বোত্তম প্রতিবেশী সে, যে তার প্রতিবেশীর কাছে উত্তম।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৪৪)
ইসলাম প্রতিবেশী ও সামাজিক সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করা ঈমানের অংশ।
দশ. সুন্দর চরিত্রই শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত মানদণ্ড
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যার চরিত্র সবচেয়ে বেশি সুন্দর।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৫৫৯)
এতে বোঝা যায়—শ্রেষ্ঠত্বের বহু দিক থাকলেও সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে সুন্দর চরিত্র।
এগারো. দ্বিনের মর্যাদা রক্ষায় সাহসী ব্যক্তি
হাদিসে এসেছে—‘মর্যাদায় সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি সে, যে শত্রুকে সন্ত্রস্ত করে এবং শত্রুরাও তাকে সন্ত্রস্ত করে।’ (বাইহাকির শুয়াবুল ঈমান, হাদিস : ৪২৯১, সিলসিলা সহিহাহ, হাদিস : ৩৩৩৩)
এটি দ্বিনের মর্যাদা রক্ষায় সাহস, দৃঢ়তা ও আত্মত্যাগের প্রতি ইঙ্গিত করে।
বারো. জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদকারী
রাসুল (সা.) বলেন—‘ওই মুমিন [সর্বশ্রেষ্ঠ] যে আল্লাহর পথে তার জান ও মাল দিয়ে যুদ্ধ করে।’ (বুখারি, হাদিস : ২৭৮৬, ৬৪৯৪)
এটি ইসলামের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের স্তর নির্দেশ করে। দ্বিনের জন্য জান ও মাল উত্সর্গ করা সর্বশ্রেষ্ঠ আমলগুলোর একটি।
সর্বোত্তম মানুষ
নবীজির চোখে সর্বোত্তম মানুষ কোনো একক গুণের অধিকারী নন; বরং তিনি এমন এক সমন্বিত ব্যক্তিত্ব, যিনি—কোরআনের সাথে যুক্ত, চরিত্রে উত্তম, মানুষের উপকারী, পরিবার ও সমাজে দায়িত্বশীল, অন্তরে পরিচ্ছন্ন, দ্বিনের জন্য আত্মত্যাগী। এই গুণাবলির সমন্বয়ই একজন মানুষকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর কাছে সর্বোত্তম বানায়। আমাদের প্রত্যেকের উচিত এই হাদিসগুলোকে শুধু পড়েই থেমে না থেকে নিজের জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা। তবেই আমরা নবীজির চোখে ‘সর্বোত্তম মানুষ’ হওয়ার পথে এগোতে পারব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সেই শ্রেষ্ঠ মানুষের কাতারে শামিল হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিআতুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া, গাজীপুর।
📝 Website Description
রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিসে বিভিন্ন গুণের অধিকারী মানুষদেরকে সর্বোত্তম বলে উল্লেখ করেছেন—যেমন যারা মানুষের উপকার করে, উত্তম চরিত্রের অধিকারী, জ্ঞান অর্জন ও বিতরণ করে এবং আল্লাহভীরু। এই প্রবন্ধে সহিহ হাদিসের আলোকে নবীজির দৃষ্টিতে সর্বোত্তম মানুষের বৈশিষ্ট্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
🏷️ Website Tags (Comma Separated)
নবীজির হাদিস, সর্বোত্তম মানুষ, উত্তম চরিত্র, ইসলামিক আদর্শ, মানবতা, কোরআন হাদিস, সীরাতে রাসুল, দাওয়াহ, নৈতিক শিক্ষা
+ There are no comments
Add yours